আজ ২রা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ :

শ্রীনগরে নৌকা ডুবিয়ে আনারসের বাম্পার ফলন

আবু জাফর আহমেদ মুকুল : গত ১১ নভেম্বর, ২০২১ইং দ্বিতীয় ধাপে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলায় ১৪টি ইউনিয়ন পরিষদে দিনভর উৎসবমুখর পরিবেশ ও ব্যাপক ভোটারের উপস্থিতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। শ্রীনগর উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ১৭ হাজার ৯৬৯ জন এবং নির্বাচনে স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করায় ভোটারের উপস্থিতি হার ছিল ৬৬.৯৮%।  তবে এ বছর পুরুষ ভোটারের তুলনায় নারী ও তরুণ ভোটারের উপস্থিতি বেশি ছিল। ব্যালট ভোটের দিন সকালে কেন্দ্রে পাঠানোর জন্য উপজেলা প্রশাসনকে স্বাগত জানিয়েছেন সাধারন মানুষ। শ্রীনগর উপজেলায় ১৪টি ইউনিয়ন থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বেসরকারী ভাবে নির্বাচিত হয়েছেন ৫টি ইউনিয়ন পরিষদে নৌকার প্রার্থী, বাকি ৯টি ইউনিয়ন পরিষদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আনারস প্রতীকের ৭জন প্রার্থী আর ২টি ইউনিয়ন পরিষদে চশমা ও টেলিফোন প্রতীকের প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। সুতরাং বলা যায়, শ্রীনগরে ইউপি নির্বাচনে নৌকা ডুবিয়ে আনারসের বাম্পার ফলন হয়েছেন। আনারসের এই বাম্পার ফলন অনেকেই অনেকভাবে বিশ্লেষন করেছেন যার মধ্যে প্রধান কারন হলোঃ মনোনয়ন বঞ্চিত আওয়ামী লীগ প্রার্থী সকলে একত্র হয়ে মনোনয়নকৃত আওয়ামী লীগ প্রার্থী নৌকার বিরুদ্ধে কাজ করেছেন এবং এর সাথে যুক্ত হয়েছেন বিএনপিসহ অন্যান্য দলের নেতা-কর্মীবৃন্দ। জাতীয় সংসদ নির্বাচন আর স্থানীয়  নির্বাচন এক নয়, এটা সম্পষ্ট কারন স্থানীয় নির্বাচনে আত্নীয়-স্বজন, এলাকা ও আভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব জড়িত থাকে। শ্রীনগর উপজেলায় একজন কেন্দ্রীয় নেতার নিজ কেন্দ্রে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী ৫৯টি ভোট  এবং অন্যদিকে আটপাড়া ইউনিয়ন পরিষদে নৌকার প্রার্থী মাত্র ১২১ ভোট পেয়েছেন যা নিয়ে জনগনের মধ্যে সর্বত্র আলোচনা-সমালোচনা  চলছে। উল্লেখ্য যে, শ্রীনগরে আওয়ামী লীগের মনোনীত নৌকা প্রার্থী হিসেবে ৫ জন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন যার মানে হলো দলীয় প্রার্থী হিসেবে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাফল্যের হার-৩৬%। তবে অনেকেই আওয়ামী লীগের মনোনয়নকৃত ৫ চেয়ারম্যানের বিজয়ে সাফল্য দেখতে নারাজ কারন তাদের মধ্যে ৪ জন প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও দক্ষ সংগঠন বলে নিজ ইউনিয়নে স্বীকৃতি রয়েছে। আবার, পাটাভোগ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে চেয়ারম্যান হামিদুল্লাহ খান মুনের মধ্যে তারুণ্যের উজ্জ্বল ভবিষ্যত দেখছেন অনেক ভোটার।

 

স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে রাজনৈতিক ছিল না। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তাই স্থানীয় মুরব্বি, গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষক, আইনজীবীরা অংশ নিতেন। কিন্তু স্থানীয় নির্বাচনেও দলীয় প্রতীকের ব্যবস্থা করে রাজনীতির বিষকে তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন আর ভালো ও সৎ মানুষের নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। এখন নির্বাচিত হতে হলে প্রথমত দলের অনুগত হতে হবে, দ্বিতীয়ত বৈধ-অবৈধ অঢেল টাকা থাকতে হবে।

স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ব্যবস্থা করে মনোনয়ন বাণিজ্যকে অনানুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এখন নির্বাচনী লড়াইয়ের চেয়ে মনোনয়ন কেনাটাই বেশি চ্যালেঞ্জিং। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন পেতে কোটি কোটি টাকা খরচ করার মতো অবিশ্বাস্য খবরও গণমাধ্যমে দেখেছি। অনেকেই দলীয় মনোনয়নের দেওয়ার আগে গোয়েন্দা রিপোর্ট করার জন্য দাবি তুলেছেন যাতে কেন্দ্র সঠিক ও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করতে পারেন।

 

বিএনপি এবার ইউপি নির্বাচনে মাঠে নেই। কেউ যদি নিজের মতো করে জিতে আসতে পারেন, তাতে বিএনপির আপত্তি নেই। কিন্তু ‘নৌকার জোয়ার ঠেকিয়ে দিচ্ছে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। মনোনয়ন কেনার লড়াইয়ে টিকতে না পারলে বিদ্রোহী হিসেবে মাঠে নেমে পড়েন আওয়ামী লীগাররাই। অনেক ধমক-ধামক দিলেও বিদ্রোহীদের কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না আওয়ামী লীগ। তবে আমার ধারণা মুখে ধমক-ধামক দিলেও বিদ্রোহীদের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের এক ধরনের ছাড় আছে।

 

শ্রীনগরে স্থানীয় সচেতন নাগরিক হিসেবে গণ্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবিসহ সকল পক্ষের আলোচনা করে নৌকার প্রার্থী পরাজয়ের নিম্নোক্ত কারনসমূহ পাওয়া যায়ঃ

১। উপজেলা আওয়ামী লীগ অভিভাবকহীন।

২। উপজেলা আওয়ামী লীগ ৩ ধারায় বিভক্ত।

৩। টাকার বিনিময়ে হাই ব্রিডদের ইউনিয়ন কমিটিতে স্থান দেওয়া।

৪। সাংগঠনিক দুর্বলতায় সুযোগ নিচ্ছে বিকল্পধারা।

৫। নৌকা পেয়ে প্রার্থীরা নেতার কাছে গিয়েছেন কিন্তু ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে পারেন নি।

৬। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিটি স্থানীয় যোগ্য নৌকার প্রার্থী নির্বাচন করতে পারেনি।

৭। বিভিন্ন স্বার্থে অনেক নেতা আওয়ামী লীগের ছদ্মবেশে তলে তলে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন।

 

৮। ভোটের আগে কয়েকজন নৌকার প্রার্থী অন্য প্রার্থীর সাথে হাত মিলিয়ে নির্বাচনের হাল ছেড়ে দিয়েছেন বলে এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে।

 

শ্রীনগরের সাধারন ভোটাররা মনে করেন, দলীয় সম্মান রক্ষার্থে পরবর্তী পর্যায়ে স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় প্রতীক থেকে বিরত রাখা দরকার। এতে দলের আভ্যন্তরীন কোন্দল হ্রাস পাবে এবং মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ থেকে দল মুক্তি পাবে। পাশাপাশি আগামি জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু পরিকল্পনায় এগিয়ে যেতে পারবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। সুতরাং সবার আগে উচিত হবে শ্রীনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সঠিক অভিভাবক নির্বাচন করা। যিনি সকলকে নিয়ে এক প্লাটফর্মে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে পারবেন। তবে তরুণ ও মহিলা ভোটার বেশি হওয়ায় তাদের বিষয়ে অগ্রগন্য ইশতেহার নিয়ে কাজ করতে হবে।

 

লেখক-  গবেষক এবং ম্যানেজমেন্ট ও লিডারশীপ বিশেষজ্ঞ

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ :