আজ ৪ঠা জুলাই, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ :

স্বপ্নের পদ্মা সেতু: উচ্ছ্বাসের আড়ালে পেশা বদলের উদ্বেগ

মো. শওকত হোসেন: রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার এ উন্নয়নের সঙ্গে শিল্প-বাণিজ্য ও পর্যটনের প্রসারের সম্ভাবনাও ব্যাপকভাবে হাতছানি দিচ্ছে। কিন্তু এমন সম্ভাবনার মধ্যেও বর্তমানে পেশাবদল নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন শিমুলিয়া-বাংলাবাজার ঘাটকেন্দ্রিক হাজার হাজার কর্মজীবী মানুষ। এরই মধ্যে বিকল্প কর্মসংস্থান বা পেশাবদল করেছেন অনেকে। অন্যদিকে সেতু চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৩ জেলার লাখ লাখ মানুষের যাতায়াতের নতুন দিগন্ত উন্মোচন হবে। দূর হবে যুগ-যুগের ভোগান্তি।
স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হতে যাচ্ছে আগামী ২৫ জুন। মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট তখন হয়ে উঠবে সুনসান। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে হারিয়ে যায় গুরুত্বও।

স্থানীয়দের অভিমত, লৌহজংয়ের শিমুলিয়া ঘাটেরও গুরুত্ব হারিয়ে যাবে। কেউ আর এই পথে আসবে না সচরাচর। সেতু চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৩ জেলার লাখ লাখ মানুষের যাতায়াতের নতুন দিগন্ত উন্মোচন হবে। দূর হবে যুগযুগের ভোগান্তি।
এ উপজেলার বুক চিরে পদ্মা সেতু হলেও এ অঞ্চলের ঘাট এলাকার মানুষ এ সুফল থেকে আপাতত বঞ্চিত হচ্ছে। এ আনন্দের আড়ালে পেশা বদলের উদ্বেগ জেলাবাসীর চোখে মুখে নেই।
তবে ঘাটকে ঘিরে যাদের সংসারের জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে তাদের কী হবে। যুগ যুগ ধরে আগলে রাখা পেশা হঠাৎ করেই ছাড়তে হবে তাদের! সংসারের চলতে থাকা চাকার গতি হঠাৎ করেই তখন কমে আসবে। তাই সেতু চালুর আনন্দের পাশাপাশি পেশা নিয়ে চিন্তার ভাঁজ দেখা দিচ্ছে তাদের কপালে।
ঘাট না থাকলে এই পেশাও থাকছে না আর। নৌরুটে ৮৭ টি লঞ্চ, দেড়শতাধিক স্পিডবোট, ৫৭ টি ফেরি বর্তমানে চলছে। এ সকল নৌযানে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী নিয়মিত পার হন। এই যাত্রীদের ওপর নির্ভর করেই হকার শ্রেণির ব্যবসা।
লৌহজংয়ের শিমুলিয়া ঘাটের হকার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিমুলিয়া ঘাটকে ঘিরে যারা জীবিকা নির্বাহ করছেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে নিরীহ হচ্ছেন ঘাটের হকার শ্রেণি। যারা লঞ্চ, ফেরিতে ঘুরে ঘুরে যাত্রীদের কাছে বিক্রি করেন ঝালমুড়ি, বাদাম, ছোলা, আচার,সেদ্ধ ডিম, সিঙ্গারা, নারকেলচিড়া, শসা, দইসহ নানা রকম মুখরোচক খাবার। প্রতিটি লঞ্চে তিন থেকে চারজন করে নানান জিনিস নিয়ে ওঠেন হকাররা। ঘাটের পন্টুনে ঘুরে ঘুরেও বিক্রি করেন অনেকে লঞ্চ, স্পিডবোট এবং ফেরিঘাটে ঘুরে ঘুরে অসংখ্য হকার শ্রেণি নানা রকম দ্রব্যাদি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। ঘাট দিয়ে যাতায়াতকারী হাজার হাজার যাত্রীই তাদের ক্রেতা। যাত্রীদের খুশি করে বিক্রি করাই তাদের কাজ। সেতু চালু হলে থাকছে না ঘাটের ব্যবহার। আর যাত্রী না থাকলে ব্যবসায়ও তাদের বন্ধ হয়ে যাবে।
শিমুলিয়া ঘাটের হকাররা জানান, সেতু চালু হওয়ার খবর আনন্দের। এই সেতুর কারণেই আমাদের দেশে আজ আনন্দের বন্য বইছে। তবে সেতু চালু হলে আমাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। ঘাটের ওপর নির্ভর করে যুগযুগ ধরে চলা এই ব্যবসা হঠাৎ করেই থেমে যাবে। আর এটাই বাস্তবতা। কিছুটা মন খারাপ হলেও সেতু চালু আনন্দের বিষয়। বিকল্প পেশা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা চলছে। তবে ঘাটের মতো এতটা ভালো হবে কিনা তা জানা নেই।

ঘাট সূত্রে জানা গেছে, শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটের উভয় ঘাটেই রয়েছে অসংখ্য হকার। যারা একমাত্র ঘাটের নৌযানে ঘুরে ঘুরে বেচাবিক্রি করে থাকেন। লঞ্চ, ফেরি ও স্পিডবোটের যাত্রীরাই হকারদের একমাত্র ক্রেতা। আর এই ঘাট এলাকায় নানান জিনিসপত্র বিক্রি হয় অনায়াসেই। পদ্মাপাড়ের এলাকার খেটে খাওয়া মানুষেরাই ঘাটে হকারি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এদের মধ্যে মুখরোচক খাবার বিক্রেতাদের সংখ্যাই হবে কমপক্ষে ৩’শ জন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত, কেউবা রাত অবধি নৌযানে ঘুরে ঘুরে নানান খাবার-দাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন।
শিমুলিয়া ঘাটের একাধিক হকারদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, বিকল্প পেশা নিয়ে সেতু নির্মাণের শুরু থেকেই তাদের অনেকের ভাবনা চলছিল। অনেকে বাড়ির কাছাকাছি ছোট্ট চা-পানের দোকান দিবেন বলে জানান। আবার কেউ নিয়মিত চাসহ খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করছেন পরিবারের অন্য কেউ। ঘাট বন্ধ হয়ে গেলে ওই ব্যবসায় নিজে সময় দেবেন। কেউ কেউ কৃষি কাজে নিয়মিত হবেন। পাশাপাশি পদ্মায় মাছ শিকার তো আছেই। এছাড়া অনেকেই শহরমুখী হবেন।

এদিকে পদ্মা সেতুকে ঘিরে পদ্মার পাড়ে একাধিক পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠছে এবং গ্রামীণ বাজার তৈরি হওয়াসহ এলাকার অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়েছে। পদ্মার পাড়ের নদী শাসন বাঁধসহ সেতু এলাকার অনেকটাই পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে শুরু করেছে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এসব পর্যটন কেন্দ্রে আসেন ঘুরতে। সেক্ষেত্রে জীবিকা নির্বাহের জন্য কিছু না কিছুর ব্যবস্থা হয়ে যাবে বলে তাদের বিশ্বাস।
লৌহজং উপজেলার বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম ঘাটে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ঘাটে হকারি করেন।ঘাটকে ঘিরেই তার বেড়ে ওঠা। সেতু চালু হবে, এ নিয়ে আনন্দ নেই তার। ঘাট বন্ধ হয়ে যাবে তাতে ব্যবসাও বন্ধ, তাই কপালে চিন্তার ভাঁজও রয়েছে। তিনি জানান, ঘাট এলাকার হকারদেরও পুনর্বাসন করা উচিত সরকারের। হঠাৎ করেই পেশা বদল করা যায় না। দীর্ঘদিনের পেশা বন্ধ হয়ে গেলে বিপাকে পড়তে হবে। হকারদের তালিকা করে সহজশর্তে ঋণ দিলে নতুন কিছু করতে পারবো।
এদিকে পদ্মা সেতু দাঁড়িয়েছে প্রমত্তা পদ্মার বুকে। এখন ওপর দিয়ে যাওয়ার দিন গুনছেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রীরা। ঘাট এলাকার যুগ যুগ ধরে চলা ভোগান্তি থেকে বাঁচবে এ জেলার যাত্রীরা। বাঁচবে সময়ও। তাই ২৩ জেলার মানুষের সেতু নিয়ে উচ্ছ্বাসের শেষ নেই। ঢাকা যেন এখন তাদের হাতের মুঠোয়!

শিবচরগামী শাহজাহান জানান তিনি বঙ্গবাজারে রেডিমেড পোশাকের ব্যবসা করেন বিগত ১৫ বছর ধরে তিনি প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর জেলার শিবচরে যান। গুলিস্তান থেকে সড়কপথে থেকে মাওয়া এসে পদ্মা নদী পাড়ি দিতে হয় তাঁকে।

খুলনাগামী সাজ্জাত জানান শিমুলিয়া স্পিডবোট ঘাটে তিনি নদী পাড়ি দিতে স্পিডবোটের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। রফিক মাতবর বলেন, এই কষ্টের দিন শেষ হইতাছে। স্পিডবোটে পার হতে ২০০ টাকা লাগে। যাত্রীদের ভিড় বেশি হইলেই তা ৩’শ টাকা পর্যন্ত উঠে যায়। ৩০ দিন পর পদ্মা সেতু চালু হইলে এই ২০০ ট্যাকার দিন শেষ হবে। আমাগো কষ্ট কমব।
রফিক মাতবর আরও জানান, স্পিড বোটে পার হতে সময় লাগে ১৫ থেকে ২০ মিনিট। কিন্তু বাস থেকে নেমে আধ কিলোমিটার হেঁটে এসে বোটে উঠতে হয়। যাত্রী পরিপূর্ণ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। সব মিলিয়ে অন্তত এক ঘণ্টা সময় লাগে। কিন্তু পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে পাঁচ থেকে ছয় মিনিটেই পাড়ি দেওয়া যাবে। ঢাকা থেকে বাসে উঠবে, আর খুলনা গিয়ে নামবেন। পদ্মা সেতু ঘিরে এমন সুখের স্বপ্ন দেখছেন রফিক।
কথা হলো শরীয়তপুরের বাসিন্দা ও মুদি দোকানের কর্মী বিল্লাল মিয়ার সঙ্গে। তিনিও বাড়ি যাচ্ছেন। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু হলেও ভোগান্তি কমবে।
রফিক ও সাজ্জাদের মতো পদ্মার ওপারের জেলা মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ, খুলনা, বরিশালসহ গোটা দক্ষিণবঙ্গের মানুষের অপেক্ষার পালা যেন শেষ হলো। ফেরিঘাটের ভোগান্তি ও বাড়তি ভাড়ায় নাকাল হতে হবে না তাঁদের।
জানা গেছে, শিমুলিয়া থেকে মাঝিরকান্দি-কাঁঠালবাড়ি যেতে লঞ্চে ভাড়া ৫০ টাকা। সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। সীমিত আয়ের মানুষের পছন্দ লঞ্চ। প্রতি ১৫ থেকে ৩০ মিনিট পরপর লঞ্চ ছাড়ে। আজ সকাল নয়টায় লঞ্চঘাটে গিয়ে দেখা যায়, মানুষের বেশ আনাগোনা। তাঁরা লঞ্চের অপেক্ষা করছেন। পদ্মার স্রোতের মধ্যেও নদী পারাপারের লোকের অভাব নেই। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর লঞ্চে নদী পার হতে হবে না। তারা বাসে চড়ে নিমেষেই পাড়ি দেবেন প্রমত্তা পদ্মা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ :