ফারুক আহমেদ
আজ ১৬ই ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস! শহরের প্রধান শহীদ স্মৃতিসৌধের চত্বরে এই মহান দিনটিকে উদযাপন করার জন্য বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে । সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সর্ব স্তরের মানুষ শহীদ স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে মহান মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানাচ্ছে। এই বিশেষ দিনে আমিও আজ সম্মান জানালাম, ৩০ লক্ষ শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের যাদের আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে আজ আমরা পেয়েছি লাল সবুজের পতাকা!
“মহান বিজয় দিবস আয়োজক” কমিটির পক্ষ থেকে, গতসপ্তাহে আমাকে একটি নিমন্ত্রণ পত্র দিয়েছে, আজ বিকাল ৫টায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সন্তানদের সংবর্ধনা ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আলোচনা সভায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে আজকের মূল আলোচনা সভায় উপস্থিত থাকার জন্য।
শহীদ স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে, দুপুরে শহরের বড় খেলার মাঠে “টি-২০ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট” ও “কাবাডি” খেলা দেখা উপভোগ করলাম। বিকাল ৩টায় চলে আসলাম, জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক দুর্লভ প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন দেখার জন্য । সেই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক দুর্লভ প্রামাণ্যচিত্রে বাঙ্গালী জাতির প্রতি পাক হানাদার বাহিনীর অত্যাচারের চিত্র দেখতে গিয়ে মনে পড়ে— গেল ১৯৭১ সালের ৬ই নভেম্বর এর সেই লোমহর্ষক স্মৃতির কথা:
দিনটি ছিল শনিবার, ৬ই নভেম্বর ১৯৭১ সাল, বিশেষ সোর্সের মাধ্যমে শুক্রবার রাতেই খবর পেলাম, পাক বাহিনী শনিবার খুব ভোরে মুন্সির হাটে আসছে এবং সকল দোকান-পাটে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিবে ! এই সেই মুন্সীর হাট যেটা এই জেলার সবচেয়ে বড় হাট, যেখানে সাপ্তাহিক হাট বসে প্রতি শনিবার । দূর দূরান্ত থেকে শক্রবার রাতেই ব্যাবসায়ীরা মালপত্র নিয়ে হাজির হয় শুক্রবার রাতের মধ্যেই ।
দু’দিন পূর্বে আমাদের পাশের রমজানবেগ গ্রামে, মুক্তি বাহিনীর ঘাঁটি আছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে, খুব ভোরে পাকিস্তানী আর্মি বাহিনী সারা গ্রাম ঘেরাও করে, এবং গ্রামের সব মানুষকে মোল্লা বাড়ির বড় উঠানে এক সাথে জড়ো করে । গ্রামের সবাইকে একসাথে জড়ো করার পর সবাইকে বলে,
“কই ইহাছে নেহি জায়েগা, তুম সবলোগ ইহাছে আপনা আপনি আদমীকো লেকে যাও” !
এইভাবে গ্রামের সব মানুষকে বড় উঠানে লাইনে দাঁড়ানোর পর, সবাই যখন যার যার পরিবারের মানুষকে এবং আত্মীয় স্বজনকে এক এক করে নিয়ে গেলো, তখন তারা রাজাকারের সংবাদের ভিত্তিতে একজনও মুক্তিযোদ্ধা পেলো না সেই উঠান থেকে ।
পরিশেষে কোন মুক্তিযোদ্ধা না পেয়ে, গ্রাম থেকে ফিরে যাবার সময় আমার বড় ভাই মজিদ মাস্টার এবং বন্ধু কাশেম ও আবুল হোসেনকে ধরে নিয়ে যায় পাক বাহিনীরা ! তাদেরকে অনেক মারধর করার পর, যখন ওদের কাছ থেকে মুক্তিবাহিনীর কোন খবর বের করতে পারল না, তখন তাদেরকে নিয়ে পাক বাহিনীর ক্যাম্পের পাশে খালের মধ্যে হাত-পা-চোখ বেঁধে গুলি করে মেরে ফেলে !
এক সপ্তাহ পূর্বে পাশের গ্রাম যোগনী ঘাটে পাকবাহিনী এসে মুক্তিবাহিনীকে ধরার জন্য সারা গ্রামে তান্ডব চালায়, এবং অনেকগুলো ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। গ্রামে কোন পুরুষ মানুষ না পেয়ে, যাবার সময় দুটি মেয়েকে ধরে নিয়ে যায়। তিন দিন পর ওদের লাশ পাওয়া যায় পাকিস্তানী বাহিনীর ক্যাম্পের পাশে রাস্তার ধারে।
পর পর এই দুটি দুঃসংবাদ পাওয়ার পর আমি মানুষিক ভাবে খুব ভারাক্রান্ত হয়ে পরি ! যে দুঃসংবাদের মধ্যে আমার বড় ভাইয়ের লাশ এবং দুই বন্ধুর লাশও আমাকে দেখতে হয়েছে ! আমি এই পাশবিক অত্যাচার ও হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার কথা ভাবতে থাকি । এমনকি পাক হানাদার বাহিনীর পুরো ক্যাম্প কিভাবে শক্তিশালী ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া যায়, সেই বিষয়টি নিয়েও এলাকার অন্যান্য মুক্তিবাহিনী টিমের সাথে পরামর্শ করি !
ঠিক এমনি সময় খবর পেলাম, পাক হানাদার বাহিনী আসছে আগামী কাল খুব ভোরে মুন্সীর হাটে আগুন লাগাতে, মানুষের জান ও মালের ক্ষতি করতে !
আমি মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার হিসেবে টিমের ১২ জন মুক্তিবাহিনীর সবার সাথে আলাপ করে একটি পরিকল্পনা হাতে নিলাম, যেখানে আমরা সবাই প্রতিজ্ঞা করলাম, পাক হানাদার বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে আমরা মরে গেলেও, আমাদের মুন্সির হাটে আগুন লাগিয়ে কোন মানুষকে হত্যা করতে বা কোন ধরণের জান ও মালের ক্ষতি করতে দিবো না ! বরং এই সুযোগে আমরা ওদের ধ্বংস করে দিব।
পরিকল্পনা অনুযায়ী আমরা গভীর রাতেই অপারেশনের প্রস্তুতিতে নেমে গেলাম ! প্রথমেই আমরা মুন্সির হাটে যাবার পথে, হাটে পৌঁছার পূর্বে লোহার ব্রিজে কয়েকটি “ডিনামাইট” ফিট করলাম, এবং একই সাথে ব্রিজের আগে প্রধান সড়কের মাঝে ছোট ছোট গর্ত করে অনেক গুলো “ডিনামাইট” বসিয়ে কালো মাটি দিয়ে সেই গর্তগুলো ঢেকে দিলাম !
আমরা আমাদের “ডিনামাইট” বসানোর কাজ শেষ করেই, বার জন সবাই ব্রিজের আগে ও পরে যার যার শক্তশালী অস্র হাতে নিয়ে পজিশন নিয়ে পাক বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। রাত ৩ টায় আমার কাছে খবর আসলো ১০-১২ টি পাকিস্তানি আর্মির গাড়ী রওয়ানা দিয়েছে আমাদের মুন্সির হাটের দিকে !
আমি গ্রুপ কমান্ডার হিসেবে সবাইকে জানিয়ে দিলাম, পাক বাহিনীর গাড়ী লোহার ব্রিজে পৌঁছতেই আমি আমার “ডিনামাইট” ফোটানোর সুইস প্রেস করবো , এবং সেই ব্রিজ এবং গাড়িটি ধ্বংস হতেই ব্রিজের আগে দাঁড়িয়ে থাকা বাকি গাড়িগুলোর নিচে যে “ডিনামাইট” ফিট করা হয়েছে তোমরা সবাই এক সাথে সুইস প্রেস করবে । তারপর শুরু হবে আমাদের ডাইরেক্ট অপারেশন !
কিছুক্ষনের মধ্যেই হেড লাইট জ্বালিয়ে পাক হানাদার বাহিনীর ১০-১২টি গাড়ী এক এক করে আশা শুরু করলো এবং সব গুলো গাড়ী ব্রিজ পার হওয়ার জন্য এক এক করে ব্রিজের আগে থামলো । আমরাও পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে লাগলাম ! যেই মাত্র দুটি গাড়ি ব্রিজের উপর পৌঁছলো, আমি ব্রিজে পেতে রাখা ৫টি “ডিনামাইট” ফাটানোর জন্য একসাথে তারের সুইচ প্রেস করলাম, অমনি সবগুলো “ডিনামাইট” ফুটে গাড়িতে আগুন ধরে গেলো, ব্রিজটিও ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো । একই সাথে ব্রিজের আগে যত গুলো গাড়ি ছিল, সেই গাড়ির নিচে পেতে রাখা ডিনামাইট গুলো এক সাথে বিকট শব্দে ফুটে উঠলো এবং পুরো ১০-১২টি পাক বাহিনীর গাড়ি ধ্বংস হয়ে যায় !
আমাদের সেই অপারেশনে কিছু পাকিস্তানী আর্মি বেঁচে গিয়ে অস্র হাতে নিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে অস্র ধরলেও, আমরা পূর্ব থেকেই পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রস্তুত থাকার কারণে, তারা আমাদের সাথে টিকে থাকতে পারে নি, এবং সেদিন কোন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বাঁচতে পারে নি ! অন্য দিকে শফিক ও বরকত নামে আমাদের দুইজন মুক্তি যোদ্ধা শহীদ হন এবং আমি আমার এক পা হারাই ওই পাকিস্তানী বাহিনীর গুলিতে ! এভাবেই সেদিন রক্ষা পেলো আমাদের মুন্সির হাট, রক্ষা পেলো শত শত মানুষ এবং অনেক সম্পদ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর আগুন থেকে !
আমাদের সেই সফল অপারেশনে পাক হানাদার বাহিনীর পুরো ১০-১২টি গাড়ি এবং তাদের সেনা সদস্য ধ্বংসের পর, পাক হানাদার বাহিনীর একটি বড় ধরণের পরাজয় ঘটে, ফলে বাকি পাকিস্তানী আর্মিরা আমাদের শহরের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যায় ! মুক্তি পায় আমাদের শহর পাকিস্তানী আর্মিদের অত্যাচার থেকে ।
একই সাথে বি. বি. সি. সহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে জানতে পারি, আমাদের মুক্তি বাহিনীর পদাতিক বাহিনীর আক্রমণ এবং আকাশ পথে বিমান হামলার ফলে পাক হানাদার বাহিনীর পরাজয় হতে থাকে সারা দেশের প্রায় সব জায়গা থেকে !
পরিশেষে ৯ মাস যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের আজকের এই দিনে, ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাকিস্তানি বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। ফলে পৃথিবীর মানচিত্রে বুকে লাল সবুজের পতাকা “বাংলাদেশ” নামে একটি নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়! এই মহান দিবস উপলক্ষে প্রতি বছর বাংলাদেশে এবং সারা বিশ্বে যেখানেই বাংলাদেশী বসবাস করছে এই ১৬ই ডিসেম্বরকে যথাযথ মর্যাদা এবং বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে পালন করা হয় ।
আজ বিকাল ৫টায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সন্তানদের সংবর্ধনা ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আলোচনা সভায়, জেলা “মহান বিজয় দিবস কমিটির” সভাপতি সাহেব আমাকে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিশেষ সম্মানে সম্মানিত করে, এবং আমাকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমার বক্তব্য পেশ করার জন্য অনুরোধ করেন ।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে আমি বলতে লাগলাম,
— আজ ১৬ই ডিসেম্বর ২০২৪ সালের এই দিনে, আমি আপনাদের মাঝে উপস্থিত থাকতে পেরে নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করছি। আজকের এই বিশেষ অনুষ্ঠানে আমাকে “বীর মুক্তিযোদ্ধা” ও বিশেষ অতিথি হিসেবে সম্মান দেওয়ার জন্য “মহান সাধীনতা দিবস উদযাপন” কমিটিকে জানাচ্ছি আমার আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা ! আজকের এই বিশেষ দিনে আমি আমার অন্তর থেকে স্মরণ করছি আমাদের সেই ৩০ লক্ষ শহীদেরকে যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজ আমরা আমাদের দেশ হয়েছে । ১৯৭১ সালের সেই যুদ্ধে আমি আমার বড় ভাই সহ, অনেক প্রিয় বন্ধু ও আত্মীয় স্বজন ও সহযোদ্ধাদেরকে হারিয়েছি, আমার নিজের একটি পাও হারিয়েছি ! আজ আমি সত্যি অনেক খুশী, যে আজ আমরা একটি লাল সবুজের পতাকা পেয়েছি, বাংলাদেশকে পেয়েছি !
সত্যি বলতে সেইদিন আমরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম, একটিই কারণে যে, আমাদের এই দেশটিকে ওই পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী থেকে মুক্তি করে, পরাধীনতার হাত থেকে আমাদের দেশটিকে স্বাধীন করতে হবে। আমাদের সব অধিকার আদায় করতে হবে, আমাদের বাক স্বাধীনতা, ভোটের অধিকার থেকে শুরু করে, আমাদের অন্ন – বস্র – খাদ্য – বাসস্থান – শিক্ষা ও চিকিৎসা সহ সকল মৌলিক অধিকার আদায় করতে হবে । সেই অধিকার আদায়ের জন্য সেইদিন ধর্ম -বর্ণ নির্বিশেষে সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালী সবাই, অল্প কিছু মানুষ ছাড়া, পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তাইতো আমরা পেরেছিলাম মাত্র ৯ মাসেই আমাদের দেশকে স্বাধীন করতে, পেরেছিলাম একটি বাংলাদেশ উপহার দিতে !
আজ আমাদের এই দেশ স্বাধীন হওয়ার কারণে, বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক একটি দেশের পরিচয় পাওয়ার সুযোগ পেয়েছে । সারা বিশ্বে আমাদের সন্তানেরা বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করে অনেক সুনাম অর্জন করছে, তৈরী হচ্ছে আমাদের বড় বড় সায়েন্টিস্ট, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও প্রফেসর সহ নানা ধরণের উন্নত কারিগরী ও দক্ষ জনশক্তি । এমনকি আমাদের সন্তানেরা অনেক কিছু আবিষ্কারও করছে, যা দেখে এবং শুনে আমার মনটাও আনন্দে ভরে যায় !
তবে দুঃখের বিষয় সাধীনতার ৫৩ বছর পেরিয়ে গেলেও আমাদের সেই স্বপ্নের “সোনার বাংলার” মুখ আজও আমরা দেখতে পারিনি । পত্রিকা খুলেই প্রতিদিন দেখতে পাই আজ চলছে সমাজে অন্যায়-অত্যাচার- অবিচার এবং ক্ষমতার অপব্যাবহার ! মানুষ পারছে না তার মৌলিক অধিকার পূরণ করতে ! হচ্ছে নানা ভাবে মানব অধিকার লঙ্ঘন, হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে গড়া হচ্ছে বিদেশে বেগম গঞ্চ । সেই দিনের অপেক্ষায় আছি, আমাদের নুতন প্রজন্মরা সুশিক্ষিত নাগরিক হিসাবে তৈরী হয়ে, আরো সুন্দর, সুশৃংখল ও শক্তিশালী সমাজ ব্যবস্থা তৈরি করবে, বাংলাদেশকে আমাদের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলবে, তবেই হবে ১৯৭১ সালের সেই ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তদানের সার্থকতা !
– সমাপ্ত –