ফারুক আহমেদ: পৃথিবীতে প্রতিটি বাবা মায়ের কাছে তার সন্তান হলো সবচেয়ে প্রিয়! শিশুর জন্মের পর, প্রতিটি বাবা মা অনেক আদর যত্ন করে তার সন্তানকে লালন পালন করেন। সন্তানের সফলতার জন্য বাবা মা, জীবনের অনেক কিছুই বিসর্জন দেন !
সেই ছোট বেলা থেকে—এই বাবা-মাই হয়ে উঠেন প্রতিটি সন্তানের সবচেয়ে কাছের মানুষ ও প্রিয়জন !
কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয় সম্প্রতিকালে এই সন্তানরা যখন বড়ো হয়, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রী অর্জন করে, চাকুরী করে – তখন অনেক বাবা মায়ের সাথে তাদের সন্তানের দূরত্ব বা গ্যাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে ! যাকে আমরা “জেনারেশন গ্যাপ” বলে থাকি !
এই জেনারেশন গ্যাপ বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে শ্রদ্ধা , ভালোবাসা, এবং বোঝাপড়ার অভাব সৃষ্টি করে। এমন পরিস্থিতি পারিবারিক বন্ধনকে অনেক দুর্বল করে তোলে।বর্তমানে অনেক পরিবারে এটা মারাত্মক আকার ধারণ করছে, যা খুবই দুঃখীজনক !
তবে এই “জেনারেশন গ্যাপ” সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। এই সমস্যা সমাধান করার জন্য। প্রথমেই আমাদের জানা দরকার জেনারেশন গ্যাপ আসলে কি এবং এই গ্যাপ এর কারণ কি ?
জেনারেশন গ্যাপ বলতে বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে বয়স, চিন্তা চেতনা, মানসিকতা, মূল্যবোধ, আচার-ব্যবহার, এবং জীবনধারার পার্থক্যকে বোঝায়।
এই পার্থক্য প্রায়ই নিজেদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি এবং সম্পর্কের টানাপোড়েন সৃষ্টি করে।
জেনারেশন গ্যাপের কারণগুলো হলো:
১. মূল্যবোধের পরিবর্তন:
প্রত্যেক প্রজন্মের জীবনধারা, চিন্তা-ভাবনা, এবং মূল্যবোধ ভিন্ন। সাধারণত: পুরোনো প্রজন্ম জীবনের প্রতি ধৈর্যশীল এবং রক্ষণশীল, আর নতুন প্রজন্ম দ্রুত ফলাফল প্রত্যাশা করে। তারা খুবই ফাস্ট, কোনো কিছুতেই তারা দেরি করতে রাজি না !
২. প্রযুক্তির প্রভাব:
আজকের তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধমের উপর নির্ভরশীল। এতে একদিকে বাবা-মায়ের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কমে যায় যাচ্ছে। অন্যদিকে সারা বিশ্বের মানুষের জীবন ধারা সম্পর্কে তারা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কিছু জানতে পারছে এবং বুঝতে চেষ্টা করছে, যা অনেক বাবা মায়ের সাথে মিল নেই !
৩. জীবনধারার ব্যস্ততা:
নুতন প্রজন্মের মানুষের কর্মক্ষেত্রের চাপ এবং ব্যক্তিগত জীবনের ব্যস্ততা সন্তানদের বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার সময় সীমিত করে তুলছে ! ফলে তারা তেমন সময় পাচ্ছেনা বাবা মাকে দিতে।
৪. সংস্কৃতিগত পরিবর্তন:
সমাজে ক্রমাগত সংস্কৃতির পরিবর্তনের ফলে বাবা-মা এবং সন্তানের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির অমিল সৃষ্টি হচ্ছে। এতে অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের সাথে বাবা মায়ের ভুলবোঝার সৃষ্টি হচ্ছে !
৫. ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধের অভাব:
আজকাল প্রায় সকল বাবা – মাই তাদের সন্তানদেরকে পার্থিব দুনিয়ার সকল সফলতা অর্জনের জন্য উচ্চ শিক্ষা সহ, সব ধরণের সহিযোগিতা করে আসছেন। কিন্তু প্রিয় সন্তানদেরকে ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধ শিক্ষা ও প্রাকটিস এর ব্যাপারে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না !
৬. যোগাযোগের অভাব:
অনেক সময় বাবা-মা ও সন্তানদের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা না হওয়ায় ভুল বোঝাবুঝি বাড়ছে। যা দিনে দিনে বাবা মায়ের সাথে সন্তানের গ্যাপ বেড়েই চলছে !
ইসলাম পারিবারিক সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। বাবা-মা এবং সন্তানদের মধ্যে সম্পর্ক মজবুত রাখার নির্দেশ কোরান ও হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
১. কোরানে নির্দেশনা:
আল্লাহ বলেন: “তোমার প্রভু নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং বাবা-মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদেরকে ‘উহ’ শব্দটি পর্যন্ত বলো না এবং তাদের ধমক দিও না। বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।” — (সূরা আল-ইসরা: ২৩)
২. হাদিসের নির্দেশনা:
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “বাবা-মা সন্তানের জন্য জান্নাতের দরজা। যদি চাও, তবে সেই দরজাকে সম্মান করো। আর যদি চাও, তবে তা নষ্ট করো।” – (তিরমিজি, হাদিস: ১৯০০).
বিশ্বের দার্শনিক, ও বিখ্যাত লেখকরা এই ব্যাপারে যা বলেছেন তা হলো:
১. কনফুসিয়াস:
“পরিবারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক সমাজে শান্তি ও স্থিতি আনে।”
২. লিও টলস্টয়: “সুখী পরিবারই সুখী সমাজের মূল ভিত্তি।”
৩. শেখ সাদী: “বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার না করা সন্তানের সবচেয়ে বড় দোষ।”
৪. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: “বৃদ্ধ যখন তরুণের সঙ্গে একাত্ম হয়, তখনই নতুন দিনের সূচনা হয়।”
৫. কাজী নজরুল ইসলাম: “বাবা-মায়ের স্নেহ এমন এক অমূল্য সম্পদ, যা পৃথিবীর কোনো কিছুতেই মাপা যায় না।”
জেনারেশন গ্যাপ দূরীকরণের উপায় গুলো হলো:
জেনারেশন গ্যাপ দূর করা সম্ভব যদি বাবা-মা এবং সন্তানেরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, এবং বোঝাপড়া বজায় রাখেন।
জেনারেশন গ্যাপ দূরীকরণে নিচে কিছু কার্যকর উপায় উল্লেখ করা হলো:
১. খোলামেলা আলোচনা:
পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিশেষ করে সন্তানদের সাথে বাবা মায়ের যেকোনো বিষয়ে নিয়মিত খোলামেলা আলোচনা করা এবং সবাই সবাইকে সময় দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের চিন্তা-ভাবনা এবং অভিজ্ঞতাগুলো শোনা উচিত।এর জন্য সাপ্তাহিক পারিবারিক মিটিং এর আয়োজন করা যেতে পারে।
২. পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ:
বাবা-মাকে সন্তানদের মতামতকে সম্মান করতে হবে এবং সন্তানদেরও বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে। যেকোনো বিষয়ে কেউ দ্বিমত থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে একমতে আসা একান্ত জরুরি !
৩. প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার:
নূতন প্রযুক্তির ব্যাপারে বাবা মাকে পিছিয়ে থাকলে চলবে না ! প্রযুক্তির মাধ্যমে সন্তানদের সঙ্গে বাবা মাকে যোগাযোগ বাড়াতে হবে । এটি সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য অত্যান্ত জরুরি। তাই বাবা মাকেও নূতন টেকজনোলোজি সম্পর্কেও আপডেট হতে হবে।
৪. একসঙ্গে সময় কাটানো:
বাবা-মা এবং সন্তানদের মধ্যে সম্পর্ক গভীর তৈরি করার জন্য তাদের সাথে একসঙ্গে সময় কাটানো, সবাইকে নিয়ে এক সাথে ঘুরতে যাওয়া বা পারিবারিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা জরুরি। সবাইকে নিয়ে কোয়ালিটি সময় একসাথে কাটাতে হবে ! যেমন ছুটির দিনগুলোতে পরিবারের সবাইকে নিয়ে নুতন কোনো জায়গাতে ঘুরে আসা !
৫. পারিবারিক সম্পর্কের গুরুত্ব বোঝানো:
বাবা-মা এবং সন্তানদের পারিবারিক সম্পর্কের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি। এই ব্যাপারে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো বেশি করে পড়ানো উচিত। এবং সমাজের সকল স্থানে, লিখনিতে, টিভি, মিডিয়া সব জায়গাতে পারিবারিক সম্পর্ক এবং এই বন্ধন আরও জোরালো করার জন্য বেশি বেশি আলোচনা হওয়া জরুরি!
৬. সহনশীলতা ও ধৈর্য:
বাবা-মা এবং সন্তানদের নিজেদের মধ্যে ধৈর্যশীল এবং সহনশীলতা বাড়াতে হইবে। যে কোনো বিষয়ে উত্তেজিত হওয়া না। আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধান করতে হবে !
৭. ধর্মীয় অনুশীলন ও মানবিক মুল্যবোধ প্রাকটিস:
প্রতিটি পরিবারে ধর্মীয় শিক্ষা ও অনুশীলন বাড়াতে হবে। একই সাথে মানবিক মূল্যবোধ শিক্ষা ও তার অনুশীলন বাড়াতে হবে। যা সাহায্য করবে ছেলে মেয়ের সাথে বাবা মায়ের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে এবং গ্যাপ দূরীকরণের !
পরিশেষে বলব, জেনারেশন গ্যাপ দূর করা এতো সহজ কাজ নয়, তবে এটি অসম্ভবও নয়।
পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং বোঝাপড়ার মাধ্যমে বাবা-মা এবং সন্তানের সম্পর্ক আরও গভীর করতে পারলেই জেনারেশন গ্যাপ দূরীকরণ করা সম্ভব। ধর্মীয় শিক্ষা এবং মনীষীদের উপদেশ অনুসরণ করে আমরা “জেনারেশন গ্যাপ”কমিয়ে আনতে পারি।
প্রতিটি তরুণ প্রজন্ম এবং বাবা-মা উভয়ের উচিত পারিবারিক সম্পর্ক ও বন্ধনের গুরুত্বকে উপলব্ধি করা। জেনারেশন গ্যাপ দূর হলে পরিবার হয়ে উঠবে আরও সুখী ও সমৃদ্ধিশালী যা বয়ে আনবে আমাদের সমাজে শান্তি, শৃংখলা ও স্থিতিশীলতা।
লেখক: কলামিস্ট – পেরেন্টস এট ফ্যাকাল্টি অফ মেডিসিন এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং।